গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামানকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির এক বিশাল সিন্ডিকেট। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা প্রদান, কাজের নিম্নমান ঢাকা এবং বিল ছাড়ানো থেকে শুরু করে বদলি-পদায়নে ক্ষমতার অপব্যবহার—সবখানেই তার ছায়া দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলা গার্ডিয়ানের নিজস্ব অনুসন্ধানে গণপূর্তের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা এই অনিয়মের নানা চিত্র উঠে এসেছে।
ই-জিপি ও টেন্ডারে সিন্ডিকেটরাজ:
বাংলা গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে জানা গেছে, গণপূর্তের বিপুল অঙ্কের উন্নয়ন ও নির্মাণকাজের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। দরপত্রের শর্ত নির্ধারণ (Elegibility criteria), কারিগরি মূল্যায়ন ও যোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কৌশলগত পরিবর্তন এনে সাধারণ ঠিকাদারদের প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে ফেলা হয়।
ই-জিপি রেকর্ড ও টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কাগজে-কলমে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র মনে হলেও বাস্তবে নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই বারবার বড় বড় কার্যাদেশ পাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রক্রিয়ার পেছনে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরের সরাসরি নির্দেশনা কাজ করে।
বাজেট স্ফীতি ও নিম্নমানের নির্মাণকাজ:
বিভিন্ন সরকারি ভবন, আবাসন প্রকল্প, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণে প্রাক্কলিত ব্যয় (Estimated Cost) কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানোর তথ্য মিলেছে বাংলা গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে।
১. কাজের পরিমাপ ও পরিদর্শনের ঘাটতি: পরিমাপ বই বা মেজারমেন্ট বুকে (MB Book) ভুয়া হিসাব দেখিয়ে অতিরিক্ত বিল উত্তোলনের ব্যবস্থা করা হয়।
২. সংশোধিত বাজেট: কাজের মান ঠিক না থাকলেও মাঝপথে বাজেট বৃদ্ধি বা ‘অতিরিক্ত আইটেম’ যুক্ত করে প্রকল্পের খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে নেওয়া হয়।
এর ফলে একদিকে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে কাঠামোগত নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে।
বিল আটকে কমিশন বাণিজ্য:
বাংলা গার্ডিয়ানের মুখোমুখি হয়ে একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেন, কাজ শতভাগ সম্পন্ন হওয়ার পরও বিল পাসের নথিপত্র দিনের পর দিন আটকে রাখা হয়। একটি নির্দিষ্ট অনানুষ্ঠানিক 'কমিশন' না দিলে নোটশিট অনুমোদন পায় না। বিল অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে সাধারণ ঠিকাদাররা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, অথচ সিন্ডিকেটভুক্ত ঠিকাদাররা কাজ শেষ হওয়ার আগেই সহজে বিল তুলে নিচ্ছেন।
বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য:
অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদ, যেমন নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী পদে পদায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক বিধিমালার তোয়াক্কা না করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাংলা গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে জানা যায়, পছন্দসই জায়গায় পদায়ন ও বদলির পেছনে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন এবং প্রশাসনিক প্রভাব কাজ করে। ফলে যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন আর সিন্ডিকেটভুক্ত কর্মকর্তারা পেয়ে যাচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ কাজের তদারকির দায়িত্ব।
সম্পদের অমিল ও বিলাসী জীবনযাপন:
প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামানের দৃশ্যমান আয়ের সঙ্গে তার ও তার পরিবারের সম্পদ এবং জীবনযাত্রার মানের চরম অসঙ্গতি লক্ষ্য করা গেছে। তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, আয়কর নথি এবং নিকটাত্মীয়দের নামে কেনা সম্পত্তির বিবরণী বিস্তারিত খতিয়ে দেখার জন্য এরই মধ্যে দাবি উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহল থেকে।
তদন্তের জোরালো দাবি
গণপূর্তের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় এই ধরনের পদ্ধতিগত দুর্নীতি ঠেকাতে অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ই-জিপি তথ্য, প্রাক্কলন নথি, এমবি বই ও পরিদর্শনের রেকর্ড পরীক্ষা করলেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।
প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্য:
উত্থাপিত অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামানের বক্তব্য জানতে বাংলা গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার লিখিত বা মৌখিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার কোনো ব্যাখা বা বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
বাংলা গার্ডিয়ানের বিশেষ অনুসন্ধান টিম এই সংক্রান্ত নথি, প্রকল্পভিত্তিক বাজেট ও টেন্ডার রেকর্ড বিশ্লেষণের অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে।
