শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
আইন-বিচারইনভেস্টিগেশনঘুষ ও অপশাসন

খোলস ভেঙে প্রকাশ্যে বিআইডব্লিউটিএর সাইদুর রহমান: নদী লুটে কোটি টাকার ‘সাম্রাজ্য’

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | দ্বিতীয় পর্ব

শেয়ার Facebook X LinkedIn WhatsApp Telegram Email
খোলস ভেঙে প্রকাশ্যে বিআইডব্লিউটিএর সাইদুর রহমান: নদী লুটে কোটি টাকার ‘সাম্রাজ্য’

প্রথম পর্বে বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং শাখার অনিয়ম, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে রহস্যজনক ‘ক্লিনচিট’ ও প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমানের পদোন্নতির চক্রান্ত তুলে ধরেছিল ‘বাংলা গার্ডিয়ান’। কিন্তু তথ্যানুসন্ধানের শিকড় থমকে থাকেনি; বাংলা গার্ডিয়ানের ইনভেস্টিগেটিভ টিমের হাতে একে একে জমা হয়েছে সরকারি নথি, মেজারমেন্ট বুক (এমবি) জালিয়াতির প্রমাণ, জালনথির উত্তরাধিকার সনদ এবং গোপন ব্যবসার ব্যাংক ট্রেইল। বাংলা গার্ডিয়ানের দ্বিতীয় পর্বের এই এক্সক্লুসিভ অনুসন্ধানে প্রতিটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিপরীতে উন্মোচন করা হলো অকাট্য দালিলিক প্রমাণ।


‘কথা বলার সময় নাই, যা পারেন করেন’: সাংবাদিককে হুমকি ও ক্ষমতার দম্ভ
ইনভেস্টিগেটিভ টিম যখন অনুসন্ধানের প্রাথমিক সত্যতা নিশ্চিত করার পর দাপ্তরিক শিষ্টাচার মেনে প্রকৌশলী সাইদুর রহমানের মুখোমুখি হয়, তখন তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনের বদলে প্রদর্শন করেন চরম অসৌজন্যমূলক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ। ১৩টি সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণভিত্তিক লিখিত প্রশ্নের জবাবে সরাসরি ফোনে তিনি দম্ভোক্তি করে বলেন:

আমার কথা বলার সময় নাই, যা পারেন করেন। আমার এতে কিছু হবে না। আমার রুমে সাংবাদিক এসে এমনিতেই বসে থাকে। আর ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও আমার অফিস কক্ষের নিয়মিত গেস্ট। সুতরাং আমাকে নিয়ে আপনারা কী নিউজ প্রকাশ করলেন, তাতে আমার কিচ্ছু আসবে যাবে না।”


প্রশাসনিক নীতিমালার তোয়াক্কা না করে একজন সরকারি কর্মকর্তার মুখে এই বক্তব্যই প্রমাণ করে, রাজনৈতিক আশ্রয়ের আড়ালে তিনি কতটা শক্তিশালী দুর্নীতির শেলে নিজেকে নিরাপদ ভাবেন এবং বিচারব্যবস্থাকে কতটা তুচ্ছজ্ঞান করেন।


বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যানের নিশ্চুপ ভূমিকা: শীর্ষ নির্বাহী কি নীরব দর্শক?
সাইদুর রহমানের দুর্নীতি, মেজারমেন্ট বুক জালিয়াতি ও জাল সনদের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তুলে ধরে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানের দাপ্তরিক অবস্থান জানতে প্রাতিষ্ঠানিক লিখিত চিঠি পাঠায় ‘বাংলা গার্ডিয়ান’। কিন্তু অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কোনো লিখিত উত্তর প্রদান করেননি।
একটি রাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে চেয়ারম্যানের এই নীরবতা সংস্থাটির ভেতরে একাধিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—তবে কি শীর্ষ পর্যায়ও সাইদুর রহমান ও তাঁর ড্রেজিং সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি, নাকি পরোক্ষ প্রচ্ছায়া দিয়ে যাচ্ছেন?


১৩৪ কোটি টাকার ‘ভৌতিক’ ড্রেজিং ও ভুয়া জ্বালানি বিল: 
নদী খননের নামে মেজারমেন্ট বুকে (MB) ভুয়া ডাটা বসানো, একই নদী বারবার খনন দেখানো এবং উদ্ধারকারী জাহাজ ও ড্রেজার না চালিয়ে কাল্পনিক জ্বালানি খরচ দেখিয়ে প্রায় ১৩৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ। বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং শাখার প্রকল্পের সাউন্ড ট্র্যাকিং ফিল্ড ডাটা এবং প্রাক্কলন নথিতে দেখা যায়, নদীতে ড্রেজিং না করেই মেজারমেন্ট বুকে শতভাগ কাজ সম্পন্ন করার ভুয়া এন্ট্রি দেওয়া হয়েছে। উদ্ধারকারী জাহাজের লগবুক ও জ্বালানি ব্যবহার রেজিস্টার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নোঙর করে রাখা জাহাজের নামে হাজার হাজার লিটার তেলের ভুয়া ভাউচার তৈরি করে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে টাকা তোলা হয়েছে।
এই ১৩৪ কোটি টাকার ভয়াবহ দুর্নীতির দায়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সাইদুর রহমানকে চট্টগ্রাম কার্যালয়ে শাস্তিমূলক বদলির আদেশ জারি করেছিল। কিন্তু অলৌকিক অর্থশক্তি ও রাজনৈতিক লবিং ব্যবহার করে তিনি সেই বদলি আদেশ হিমাগারে পাঠিয়ে দেন এবং উল্টো অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলীর আসনে বসতে সক্ষম হন!


শত কোটির কালো টাকা বৈধ করতে ‘জাল উত্তরাধিকার সনদ’: 
স্ত্রী শামিমা আক্তার ও নিজের নামে থাকা শত কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদকে বৈধতা দিতে জাল উত্তরাধিকার কাগজপত্র তৈরি ও জমা দেওয়া।
দুদকের নোটিশের প্রেক্ষিতে সাইদুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী সম্পদ বিবরণী জমা দেন। এতে কোটি কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির উৎস হিসেবে তাঁরা দাবি করেন, এসব সম্পদ তাঁরা ‘উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত’। কিন্তু অনুসন্ধানী গোয়েন্দা দল ও নথিপত্র যাচাই করে বের করে আনে যে, তাঁদের জমাকৃত উত্তরাধিকার সংক্রান্ত সমস্ত হলফনামা ও দলিলপত্র সম্পূর্ণ ভুয়া, বানানো এবং জালিয়াতি করে তৈরি করা।


কুড়িগ্রামে ৫০ কোটি টাকার গোপন ‘রড-সিমেন্ট’ সাম্রাজ্য: 
ড্রেজিং খাতের কমিশন বাণিজ্য ও ভুয়া বিল থেকে অর্জিত কালো টাকা দিয়ে নিজ জেলায় ৫০ কোটি টাকার বেনামি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।  কুড়িগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্রে সাইদুর রহমান তাঁর অবৈধ উপার্জনের প্রায় ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে একটি বিশালাকার রড ও সিমেন্টের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। কাগজে-কলমে নিজের নাম আড়াল করতে ট্রেড লাইসেন্স ও ব্যবসার মালিকানায় বসিয়েছেন আপন ভাই আব্দুল আলীম-কে। তবে মূল বিনিয়োগ, ব্যাংকিং লেনদেন ও পরিচালন মুনাফার মূল নিয়ন্ত্রক সাইদুর রহমান নিজেই।


খিলগাঁওয়ে ১৮০০ বর্গফুটের আলিশান ফ্ল্যাট ও বেনামি বিলাস গাড়ি: 
রাজধানীতে বেনামে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয় এবং কর ফাঁকি দিতে অন্যের নামে একাধিক দামি গাড়ি নিবন্ধন।
খিলগাঁওয়ের ২৫/বি নম্বর রোডের ‘এম ডব্লিউ মানামা হাইটস’-এর ৮ম তলায় সাইদুর রহমানের ১,৮০০ বর্গফুটের একটি রাজকীয় ফ্ল্যাট রয়েছে। লোকচক্ষু ও আয়কর বিভাগের চোখ ফাঁকি দিতে তিনি প্রচার করতেন ফ্ল্যাটটি তাঁর ‘শ্বশুরের সম্পদ’। এ ছাড়া তাঁর পরিবারের ব্যবহৃত একাধিক বিলাসবহুল গাড়ির অনবোর্ডিং কাগজপত্র যাচাই করে দেখা গেছে, সেগুলোর আসল মালিকানা তিনি অন্য ব্যক্তিবর্গের নামে নিবন্ধিত করে রেখেছেন।


অপরাধের আড়ালে অদৃশ্য হাত: 
মেজারমেন্ট বুকের কারচুপি, জাল উত্তরাধিকার সনদ, ৫০ কোটি টাকার বেনামি ব্যবসা এবং খিলগাঁওয়ের সুনির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের ঠিকানা প্রমাণ করে দেয়—সাইদুর রহমানের দুর্নীতির সাম্রাজ্য কতটা বিস্তৃত। ১৩টি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ঔদ্ধত্য দেখানো কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশ করা আসলে নিজের অপরাধ ঢেকে রাখার একটি ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র।


রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও নদী রক্ষার স্বার্থে বাংলা গার্ডিয়ানের এই চোখখোলা অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।
(চোখ রাখুন আগামী তৃতীয় পর্বে: সাইদুর রহমানের বেনামি ব্যাংক হিসাবের গোপন স্টেটমেন্ট, নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সিন্ডিকেশন ও বিদেশে অর্থ পাচারের এক্সেক্লুসিভ নথি সহ বিস্তারিত...)

শেয়ার Facebook X LinkedIn WhatsApp Telegram Email