প্রথম পর্বে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নগর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন শাখার কর্মকর্তা মোহাম্মদ নূর-ই খোদার বিরুদ্ধে নকশা অনুমোদন ঘিরে গড়ে তোলা সিন্ডিকেট, ঘুষের নির্দিষ্ট ‘রেটকার্ড’ এবং অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের প্রাথমিক তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল। রাজউকের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের গভীরে পৌঁছাতে বাংলা গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানী দল মুখোমুখি হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর নথি, সরেজমিন পরিদর্শন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাথমিক নথিপত্রের।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) জমা দেওয়া মোহাম্মদ নূর-ই খোদার আয়কর বিবরণী (ট্যাক্স ফাইল) পর্যালোচনা করে বাংলা গার্ডিয়ানের অনুসন্ধান দল এক বিশাল গাণিতিক অসংগতি পেয়েছে।
নূর-ই খোদা ২০০৪ সালের ৩ নভেম্বর সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে রাজউকে যোগ দেন। সরকারি বেতন স্কেল ও ভাতা অনুযায়ী ২১ বছরের চাকরিজীবনে তার মোট অর্জিত বৈধ আয় (উৎসে কর কেটে নেওয়ার পর) আনুমানিক ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। এনবিআরের নথিতে তিনি তার বার্ষিক আয় ও সঞ্চয়কে সরকারি স্কেলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেখিয়ে একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত ট্যাক্স ফাইল বজায় রেখেছেন।
অথচ, বাংলা গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে উন্মোচিত বাস্তব দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজউকে নূর-ই খোদার দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সম্পত্তির আনুমানিক বাজারমূল্য ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
১. আয় ও সম্পদের ব্যবধান: বৈধ চাকরিসূত্রে অর্জিত আয়ের সাথে দৃশ্যমান সম্পদের ব্যবধান প্রায় ৯৯ শতাংশ।
২. কর ফাঁকির কৌশল: উত্তরার বহুতল ভবন, সাভার ও জামালপুরের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সিংহভাগই আয়কর বিবরণীতে প্রদর্শন করা হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্পিত সম্পদের মূল্যায়নে প্রকৃত বাজারমূল্যের ১০ ভাগের ১ ভাগ দেখিয়ে এনবিআরকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে।
বাংলা গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানী দল নূর-ই খোদার সাম্রাজ্য দেখতে সরজমিনে ঘুরে দেখেছে ঢাকা, সাভার, আশুলিয়া এবং তার নিজ এলাকা জামালপুরের ইসলামপুর। রাজধানীর উত্তরায় নূর-ই খোদার ৮ তলা বিশিষ্ট বিলাসবহুল ভবন রয়েছে, যার ৬টি ইউনিটের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকার উপরে। সাভার ও আশুলিয়া মৌজায় তার ও তার পরিবারের নামে নথিভুক্ত রয়েছে শত বিঘা জমি। এছাড়া রাজউকের আওতাধীন উত্তরা ও পূর্বাচল প্রকল্পে নামে-বেনামে একাধিক প্লট এবং ঢাকার বিভিন্ন স্থানে প্রায় ২০টি তৈরি ফ্ল্যাটের মালিকানার সন্ধান পাওয়া গেছে।
নূর-ই খোদার জন্মস্থান জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার গঙ্গাপাড়া গ্রামে একসময় তার সাধারণ পারিবারিক পটভূমি থাকলেও, বর্তমানে তিনি ওই এলাকার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। বাংলা গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে দেখা যায়, নিজ এলাকায় তিনি গড়ে তুলেছেন একাধিক আধুনিক বহুতল আবাসিক ভবন।
নূর-ই খোদার পারিবারিক ও বেনামী প্রভাবে গড়ে উঠেছে:
১. একাধিক বিশাল রাইস মিল
২. ইটভাটা ও ওয়াশিং প্ল্যান্ট
৩. ফুড প্রসেসিং ও দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা
এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের আনুষ্ঠানিক কাগজপত্রে নূর-ই খোদার নিজের নাম না থাকলেও, পরিচালনায় রয়েছেন তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন ও বিশ্বস্ত বেনামদাররা।
রাজউকের নগর পরিকল্পনা শাখার এই কর্মকর্তার প্রভাবের মূল ভিত্তি ছিল বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ডিএপি বা ড্যাপ)-এর ছাড়পত্র ও নকশা অনুমোদন দেওয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতা। রাজউকের ভেতরের সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, ড্যাপ সংশ্লিষ্ট ফাইলেই তার স্বাক্ষর ছাড়া অগ্রগতির কোনো সুযোগ ছিল না।
বাংলা গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে উঠে আসা ঘুষের নির্ধারিত হার:
১. ১ থেকে ৬ তলা ভবন: ১০ লাখ টাকা।
২. ৬ থেকে ১০ তলা ভবন: ২০ লাখ টাকা।
৩. ১০ তলার ঊর্ধ্বে থেকে ২০ তলা পর্যন্ত: ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা।
আবাসন কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে ফাইল আটকে রাখা এবং পরবর্তীতে দর-কষাকষির মাধ্যমে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এমনকি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে শুরু করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বিএনপি সরকারের বর্তমান মেয়াদেও তার এই প্রভাবশালী অবস্থান ও সিন্ডিকেট কার্যক্রম একই দাপটে অব্যাহত থাকার তথ্য মিলেছে। আলোচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী 'গোল্ডেন মনি’র সাথেও তার যৌথ ব্যবসা ও লেনদেনের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছে রাজউকের ভেতরের সূত্র।
ধানমন্ডি-হাজারীবাগ এলাকার বাসিন্দা জাবেদ শেখ ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) নূর-ই খোদার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এই অভিযোগের সূত্রে উচ্চপর্যায়ের সংস্থাগুলোর পদক্ষেপ জানতে চায় বাংলা গার্ডিয়ান । দুদকের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বাংলা গার্ডিয়ানকে জানান, "রাজউকের মোহাম্মদ নূর-ই খোদার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ ও প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ আমাদের হাতে এসেছে। তার বার্ষিক আয়কর নথি এবং বাস্তব সম্পদের যে অসংগতি দেখা যাচ্ছে, তা নজিরবিহীন। প্রাথমিক যাচাই শেষে তার নামে ও বেনামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানে শিগগিরই আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।"
রাজউকের বর্তমান চেয়ারম্যানের আশীর্বাদে নূর-ই খোদা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছেন বলে অনেকে অভিযোগ করেছে বাংলা গার্ডিয়ানকে ।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা গার্ডিয়ানকে নিশ্চিত করেন, রাজউকের কতিপয় কর্মকর্তা ও কর্মচারীর কারণে পুরো প্রশাসনিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে রাজউক চেয়ারম্যানকে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের তালিকা করে তাদের পদায়ন পুনর্বিবেচনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দুই দশকের চাকরিতে সাধারণ এক সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হলেন—এই প্রশ্নের উত্তর এখন সাধারণ সেবাগ্রহীতা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার আদালতের বিচারে। দুর্নীতি দমন কমিশনের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ও এনবিআরের সঠিক কর মূল্যায়নের মাধ্যমেই রাজউকের সিন্ডিকেট রাজত্বের অবসান সম্ভব। বাংলা গার্ডিয়ানের এই বিশেষ অনুসন্ধান জনস্বার্থে অব্যাহত থাকবে।
