শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
ইনভেস্টিগেশনঘুষ ও অপশাসনঅর্থপাচার ও ব্যাংক

রাজউকের নূর-ই খোদার সম্পদের নেপথ্যে কী?

প্রথম পর্ব: : প্ল্যান অনুমোদন ঘিরে কোটি টাকার ঘুষের রাজত্ব

শেয়ার Facebook X LinkedIn WhatsApp Telegram Email
রাজউকের নূর-ই খোদার সম্পদের নেপথ্যে কী?

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নগর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন শাখার কর্মকর্তা মোহাম্মদ নূর-ই খোদার বিপুল সম্পদ অর্জন, ভবন প্ল্যান অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং ব্যাপক ঘুষ লেনদেনের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে বাংলা গার্ডিয়ানের বিশেষ অনুসন্ধানে। দুই দশকেরও বেশি সময়ের সরকারি চাকরিজীবনে জালিয়াতি ও ঘুষের ওপর ভর করে তিনি গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদের পাহাড়।

গ্রামের বাড়ি থেকে রাজধানীর অভিজাত পাড়ায় সম্পদের সাম্রাজ্য: 
জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার গঙ্গাপাড়া গ্রামের এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা মোহাম্মদ নূর-ই খোদা ২০০৪ সালের ৩ নভেম্বর সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে রাজউকে যোগ দেন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই দুই দশকে নিজ এলাকা জামালপুরে তিনি গড়ে তুলেছেন বহুতল ভবন, রাইস মিল ও বিপুল পরিমাণ জমি। একই সঙ্গে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় স্ত্রী, সন্তান ও নিজ নামে ফ্ল্যাট, প্লট ও বাণিজ্যিক সম্পত্তির একটি শক্ত বলয় তৈরি করেছেন। উত্তরা এলাকার মতো অভিজাত পাড়ায় তার একটি বহুতল ভবন রয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা। এছাড়া সাভার ও আশুলিয়া এলাকায় জমি, ফ্ল্যাট ও প্লটসহ বিপুল সম্পত্তির মালিকানা নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ফাইল আটকে দর-কষাকষি: সিন্ডিকেটের মূলহোতা
নূর-ই খোদার বিরুদ্ধে ওঠা সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি—রাজউকের প্ল্যান অনুমোদন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নিজস্ব সিন্ডিকেট গড়ে তোলা। ভবনের আকার, তলার সংখ্যা ও প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে তিনি সরাসরি মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করতেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, ছোট ভবনের নকশা অনুমোদনে কয়েক লাখ টাকা থেকে শুরু করে বড় আবাসন প্রকল্পের অনুমোদনে কয়েক লাখ থেকে কয়েক দশ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হতো।
বিশেষ করে ঢাকা, সাভার, আশুলিয়া ও কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন আবাসন কোম্পানির ছাড়পত্র ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় তার একক প্রভাব ছিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা বাংলা গার্ডিয়ানকে জানান, ফাইল আটকে রেখে অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করা ছিল এই চক্রের মূল কৌশল। পরবর্তীতে দর-কষাকষির মাধ্যমে চুক্তি চূড়ান্ত হলে তবেই সচল হতো স্থবির ফাইল।

দালাল বাহিনী, ক্যাডার ও গোল্ডেন মনির সংযোগ: 
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, রাজউক কার্যালয়ে নূর-ই খোদার একটি নিজস্ব দালাল বাহিনী রয়েছে। তার অনিয়ম ও দুর্নীতির সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদের ক্যাডার ও সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে শায়েস্তা করার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন একাধিক সংবাদকর্মী। রাজউকের উর্ধবতন কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময় তাকে সতর্ক করলেও অজ্ঞাত কারণে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি।
জাল-জালিয়াতির সঙ্গেও তার নাম জড়িয়েছে। রাজউকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বহুল আলোচিত ‘গোল্ডেন মনির’-এর সঙ্গে নূর-ই খোদার প্রত্যক্ষ ব্যবসার সম্পর্ক ছিল এবং রাজউকের বহু বিতর্কিত ফাইলের গোপন সাক্ষী তিনি নিজেই।

দুদকে অভিযোগ ও অভিযুক্তের বক্তব্য: 
২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ধানমন্ডি-হাজারীবাগ এলাকার এক বাসিন্দা শেখ এই রাজউক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে নূর-ই খোদার সম্পদের উৎসের অনুসন্ধান, দায়িত্ব পালনে অনিয়ম এবং দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, প্রশাসনিক ও প্রভাবশালী বলয়ের ছত্রছায়ায় থাকার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে মোহাম্মদ নূর-ই খোদা বাংলা গার্ডিয়ানের কাছে সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ফোনালাপের একপর্যায়ে বাংলা গার্ডিয়ানের ইনভেস্টিগেটিভ টিমের সদস্যের ওপর চড়াও হন এবং উত্তেজিত বাক্যবিনিময় করেন। অভিযোগের সত্যতা বিচারে তিনি বাংলা গার্ডিয়ানকে রাজউক কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণসহ আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
 

পরবর্তী পর্বে থাকছে (দ্বিতীয় পর্ব):
১. কর নথির অসংগতি: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (NBR) জমা দেওয়া মোহাম্মদ নূর-ই খোদার সম্পত্তি বিবরণী (ট্যাক্স ফাইল) এবং বাংলা গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে পাওয়া দৃশ্যমান সম্পদের বিশাল ব্যবধানের গাণিতিক ও বাস্তব বিশ্লেষণ।

২. সচিত্র প্রমাণ: ঢাকা, সাভার, আশুলিয়া ও জামালপুরে ছড়িয়ে থাকা বেনামী জমি, বহুতল ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সরেজমিন সচিত্র প্রতিবেদন।
৩. উচ্চপর্যায়ের জবাবদিহি: কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির তথ্যপ্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে এই সিন্ডিকেট? দুদক কর্মকর্তা, রাজউকের নীতি-নির্ধারক এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলদের বিস্ফোরক বক্তব্য।

শেয়ার Facebook X LinkedIn WhatsApp Telegram Email