শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
ইনভেস্টিগেশনঘুষ ও অপশাসন

মেগা দুর্নীতির মহাকাব্য: কোটি টাকার ‘ক্লিনচিট’ ও পদোন্নতির পুরস্কার—ড্রেজিং কাণ্ডের খলনায়ক বিআইডব্লিউটিএর প্রধান প্রকৌশলী সাইদুর রহমান

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | প্রথম পর্ব

শেয়ার Facebook X LinkedIn WhatsApp Telegram Email
মেগা দুর্নীতির মহাকাব্য: কোটি টাকার ‘ক্লিনচিট’ ও পদোন্নতির পুরস্কার—ড্রেজিং কাণ্ডের খলনায়ক বিআইডব্লিউটিএর  প্রধান প্রকৌশলী সাইদুর রহমান

নদীমাতৃক বাংলাদেশের নৌপথ সচল রাখার নামে বছরের পর বছর চলেছে হাজার হাজার কোটি টাকার হরিলুট। সরকারি কোষাগারের রাজস্ব ছাই করে বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং শাখায় গড়ে তোলা হয়েছিল দুর্নীতির এক অপ্রতিরোধ্য সাম্রাজ্য। আর এই অনিয়ম, জাল সনদ, কমিশন বাণিজ্য ও বিল জালিয়াত চক্রের মূল কাণ্ডারী হিসেবে যার নাম বারবার উঠে এসেছে, তিনি প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমান।
অবাক করার বিষয় হলো—যার বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার দুর্নীতি, স্ত্রীসহ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ভুয়া নথিপত্র ব্যবহারের পাহাড়সম প্রমাণ রয়েছে, তাকে শাস্তির মুখোমুখি করা তো দূরের কথা, সম্প্রতি প্রমোশন দিয়ে বসানো হয়েছে বিআইডব্লিউটিএর প্রধান প্রকৌশলীর মতো সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী চেয়ারে! কীভাবে শত অভিযোগের পরও তিনি একের পর এক পদোন্নতির পুরস্কার পেলেন? কীভাবে দুদক থেকে রহস্যজনকভাবে নাম খারিজ হলো? ‘বাংলা গার্ডিয়ান’-এর অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আড়ালে চলা সেই থলেভরা বিড়ালের চাঞ্চল্যকর কাহিনী।


কোটি টাকার বিনিময়ে দুদকের ‘ক্লিনচিট’ ও আইনি অলৌকিকতা: 
ড্রেজিং শাখায় সিন্ডিকেট গড়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, ভুয়া ড্রেজিং দেখিয়ে বিল পাস এবং স্ত্রীসহ কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পত্তি অর্জনের অভিযোগে সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল, এবার হয়তো নথিপত্রের সত্যতা বেরিয়ে আসবে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে অনুসন্ধানের চূড়ান্ত পর্যায়ে দুদক জানায়—সাইদুর রহমান ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের কোনো সত্যতা মেলেনি! ফলে মামলাটির আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে তাকে পূর্ণাঙ্গ ‘অব্যাহতি’ দেওয়া হয়। তবে বাংলা গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক বিস্ফোরক তথ্য। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রশাসনিক ভেতরের তথ্যমতে, এই অলৌকিক ‘ক্লিনচিট’ বা নিষ্কলঙ্ক সনদের পেছনে গোপনে লেনদেন হয়েছে কয়েক কোটি টাকার অবিশ্বাস্য অঙ্কের অর্থ! দুদকের নথিপত্র ও অনুসন্ধানী ড্রাফটকে কৌশলে পরিবর্তন করে কাগজপত্রে সব অনিয়ম ঢেকে দেওয়ার এই চুক্তি সম্পন্ন হয়। ফলে শত প্রমাণের তথ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও সরকারি খাতায় নিমিষেই ‘ধোয়া তুলসী পাতা’ বনে যান এই কর্মকর্তা।
 

জাল সনদ, সিন্ডিকেট রাজত্ব ও সম্পদের পাহাড়: 
বিআইডব্লিউটিএর অভ্যন্তরীণ সূত্র ও সংগৃহীত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সাইদুর রহমানের চাকুরির শুরুটাই হয়েছিল বড় ধরনের ধোঁয়াশা দিয়ে। তাঁর জমা দেওয়া শিক্ষাগত ও পেশাগত সনদের মধ্যে মারাত্মক গরমিল ও জালিয়াতির প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে। এই জাল সনদের শক্তিতেই তিনি প্রশাসনিক সিঁড়ি ডিঙিয়ে প্রমোশনের চূড়ায় পৌঁছান। ড্রেজিং শাখায় থাকাকালে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বারবার কাজ পাইয়ে দেওয়া, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনৈতিক কমিশন দাবি এবং মেজারমেন্ট বুকে ভুয়া ডেটা বসিয়ে নদী খনন ছাড়াই শত কোটি টাকার বিল পাসের অঘোষিত নিয়ন্ত্রক ছিলেন তিনি। ক্ষমতার এই অপব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত বিশাল অর্থ তিনি ও তাঁর স্ত্রী রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট, জমি ও বেনামি ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন, যার কোনো বৈধ আয়ের উৎস হিসাব মেলানো সম্ভব নয়।


উত্তর এড়াতে দায়সাড়া ‘প্রতিবাদ’, বাংলা গার্ডিয়ানের একটি প্রশ্নেরও জবাব মেলেনি: 
সাইদুর রহমানের এই দুর্নীতির সাম্রাজ্য নিয়ে গভীর তদন্ত শুরু করে ‘বাংলা গার্ডিয়ান ইনভেস্টিগেটিভ টিম’। অনুসন্ধানের খাতিরে বস্তুনিষ্ঠতা ও সাংবাদিকতার নৈতিকতা বজায় রাখতে তাঁর বক্তব্য নেওয়া অতীব জরুরি ছিল। কিন্তু বাংলা গার্ডিয়ানের মুখোমুখি হতে তিনি চরম অনিচ্ছা ও এড়ানোর কৌশল অবলম্বন করেন।
মোবাইলে মেলেনি সাড়া: বাংলা গার্ডিয়ানের টিম থেকে সাইদুর রহমানের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার জন্য একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্রশ্ন উত্তর এড়িয়ে পূর্ব-প্রতিবাদ: চূড়ান্ত অনুসন্ধানের স্বার্থে বাংলা গার্ডিয়ান প্রাতিষ্ঠানিক চিঠি তাঁর নিকট পাঠানো হয়। চিঠিতে ড্রেজিং দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য, টেন্ডার কারচুপি, মেজারমেন্ট বুক জালিয়াতি, কোটি টাকার বিনিময়ে দুদক থেকে অব্যাহতি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনসংক্রান্ত ১৩টি সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণভিত্তিক প্রশ্ন উপস্থাপন করে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত বক্তব্য চাওয়া হয়।
তবে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাহস দেখাননি প্রকৌশলী সাইদুর রহমান। প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই তিনি অন্য কিছু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নিজের স্বপক্ষের সংবাদের লিংক এবং ঢাকার বাইরে থাকার অজুহাত দেখিয়ে একটি দায়সাড়া জবাব পাঠান। বাংলা গার্ডিয়ানের ১৩টি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের একটি প্রশ্নেরও ব্যাখ্যা বা প্রাতিষ্ঠানিক উত্তর প্রদান করতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।

বাংলা গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে—অন্য কোনো গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বা পিঠ বাঁচানো নিবন্ধ কখনো স্বাধীন অনুসন্ধানের বিকল্প হতে পারে না। উত্তর না দিয়ে দায়সাড়া প্রতিবাদলিপি পাঠিয়ে শত কোটি টাকার দুর্নীতির সত্যতা ঢাকা সম্ভব নয়।


পদোন্নতির ‘পুরস্কার’ ও পরবর্তী ধাক্কা: 
বিআইডব্লিউটিএর মতো একটি অতি সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে শত শত কোটি টাকার অনিয়মের প্রধান অভিযুক্তকে বরখাস্ত না করে উল্টো প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দেওয়ার পেছনে কোন অদৃশ্য হাতের ইশারা কাজ করেছে—তা নিয়ে সংস্থাটির ভেতরে-বাইরে এখন তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় চলছে। কোটি টাকার বিনিময়ে অর্জিত দুদকের অব্যাহতি ও পদোন্নতির এই বর্ম দিয়ে কি সত্যিই অপরাধ ঢাকা সম্ভব?
 

বিআইডব্লিউটিএর কোন কোন প্রকল্পে ড্রেজিংয়ের নামে ভুয়া বিল করে সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়েছে? মেজারমেন্ট বুক ও টেন্ডারের ভেতরের বিস্ফোরক নথিপত্র কী বলছে?
 

(চোখ রাখুন আগামী দ্বিতীয় পর্বে: যে ১৩টি প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রধান প্রকৌশলী সাইদুর রহমান ভয় পেয়েছেন—সেই প্রশ্নগুলোর পেছনের এক্সেক্লুসিভ নথিপত্র, প্রকল্পভিত্তিক ভুয়া বিল ও টেন্ডার কারচুপির গা ছমছমে প্রমাণসহ বিস্তারিত রূপরেখা।)

শেয়ার Facebook X LinkedIn WhatsApp Telegram Email